ম্যাক্সিম গোর্কির মা শরৎচন্দ্র রচনাসমগ্র থেকে শুরু করে আরও কত কী
বই পড়েই জেনেছেন বেগম রোকেয়ার কথা
ছোট্ট মনে তা ভীষণ নাড়া দিয়েছিল
ভাবতেন পর্দাপ্রথার মধ্যে থেকে কত কষ্ট করে লেখাপড়া করেছেন বেগম রোকেয়া
নারীসমাজকে নতুন পথ দেখিয়েছেন
সারা জীবনে এই ভাবনা তাঁকে প্রভাবিত করেছে
আজও তিনি তা ভাবেন
এখনো বারবার পড়েন বেগম রোকেয়ার রচনাসমগ্র
অনুপ্রাণিত হন
সেই আদর্শে তিনিও পথ চলেছেন
নারীর উন্নয়নে কাজ করে গেছেন
কৃতী সেই মানুষটি হলেন নাজমা চৌধুরী যাঁর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ

এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা
পরপর দুই সন্তানের মৃত্যু হয় চৌধুরী ইমামুজ্জামান ও আমিরুন্নেসা খাতুন দম্পতির
আগের দুটি সন্তান ছিল মেয়ে
তাই নাজমা চৌধুরীর জন্মের পর খুশির শেষ ছিল না এই দম্পতির
১৯৪২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সিলেট শহরে তাঁর নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন
তাঁর বাবা চৌধুরী ইমামুজ্জামান পুরকৌশলী ছিলেন
তাঁর ছিল বদলির চাকরি নানা জায়গায় বাবার সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন
স্কুলজীবন শুরু হয় ভারতের আসামে
সেখানে একটি স্কুলে শিশু শ্রেণীতে ভর্তি হন নাজমা চৌধুরী
এরপর দেশ ভাগ হয়
১৯৪৭ সালে চলে আসেন বাবার নতুন কর্মসংস্থল পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায়
তাঁর মা আমিরুন্নেসা খাতুন ছিলেন গৃহিণী
তবে সাধারণ গৃহিণীদের মতো ছিলেন না
প্রচুর বই পড়তেন
স্কুলের গণ্ডি শেষ হওয়ার আগে তাঁর বিয়ে হয়
বিয়ের পর চৌধুরী ইমামুজ্জামান বাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখেছিলেন
আমিরুন্নেসা খাতুন সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা ছিলেন
চাইতেন মেয়ে গান শিখুক
ভালো ফল করতে হবে
তবে তাঁকে অবশ্যই ভালো মানুষ হতে হবে
সেই চেষ্টাই মা করেছেন
বললেন নাজমা চৌধুরী
ঢাকায় এসে পুরানা পল্টনের বিদ্যামন্দির স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি
পরের বছর আবার তাঁর বাবা বদলি হলেন
এবারের গন্তব্যস্থল রাজশাহী
রাজশাহীর পিএন গার্লস স্কুলে ভর্তি হন চতুর্থ শ্রেণীতে
অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সেখানেই লেখাপড়া করেছেন
এর মধ্যে তাঁর আরও দুই ভাইবোনের জন্ম হয়
পদ্মাপাড়ের ধারে সরকারি বাসভবনে থাকতেন তাঁরা
প্রায়ই খুনসুটিতে মেতে উঠতেন
তাঁদের বাড়িতে আম লিচুগাছ ছিল
ফলের মৌসুমে গাছের নিচ দিয়ে হাঁটতে ভালোবাসতেন
তবে রাজশাহীতে থাকাকালের একটি স্মৃতি তাঁর প্রায়ই মনে পড়ে
পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়েন
এক ইংরেজ মেয়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়েছিল
জেনিফার নামের মেয়েটি পুরোদস্তুর ইংরেজ
ছোট্ট নাজমা তখন ইংরেজি বুঝতেন না
বলতেও পারতেন না
জেনিফার যখন রাজশাহী ছেড়ে চলে যান খুব কেঁদেছিলাম
জানি না ও কোথায় আছে
কী অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল আমাদের
বলেন তিনি

কৃতিত্বের শুরু
বাবার ফের বদলি
ফিরতে হলো ঢাকায়
ঢাকার কামরুন্নেসা গার্লস স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা এসএসসি দিয়েছেন ১৯৫৬ সালে
তাঁর কৃতিত্বের শুরুটা হয় সেখান থেকে
মেধাবী এই মেয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের অধীনে মেয়েদের মধ্যে মেধা তালিকায় অষ্টম স্থান অর্জন করেন
এর পেছনে মায়ের অবদান বেশি ছিল
বাবাও সব সময় খেয়াল রাখতেন
পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে প্রশ্নের সঙ্গে উত্তর মিলিয়ে নিতেন
বাবাকে তো বলতে হবে
একবার ফল একটু খারাপ হওয়ায় বাবা তিরস্কার করেছিলেন
শুধু বলেছিলেন লাবণ্যকে বাড়িতে সহায়তাকারী মেয়ে ছাড়িয়ে নাজমাকে বলো সেসব কাজ করতে
খুব কষ্ট পেয়েছিলেন বাবার সেদিনের কথায়
তবে এতে তাঁর লেখাপড়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়
এর মধ্যে জন্ম হয় তাঁর সবচেয়ে ছোট ভাইটির
হলিক্রস কলেজে ভর্তি হন
যদিও তাঁর ইচ্ছা ছিল ইডেন কলেজে পড়ার
কিন্তু মা-বাবার এই ইচ্ছার মূল্যর জন্য আজ তিনি অনেক কিছু পেয়েছেন
জীবনের শৃঙ্খলাবোধ মানবিকতা ও নিয়মনীতিটা এখান থেকেই শিখেছিলেন এখন পর্যন্ত যা তাঁর কাজে লাগছে
তা মেনেও চলেন তিনি
কলেজে জোসেফ বার্নার্ড হাবিবুল্লাহ বাহার রোজ মেরী শামসুন নাহার মাহমুদের মতো শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন
মায়ের খুব শখ ছিল আমি গান গাই
কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর ভালো ছিল না
তাই হাতে তুলে নিলাম গিটার
গিটার বাজাতে খুবই ভালো লাগত
বাংলাদেশ বেতারেও নিয়মিত গিটার বাজিয়েছি পরে পিএইচডি করতে যাওয়ায় আর গিটার বাজানো হয়নি
খেলাধুলায়ও ভালো ছিলাম না
বিশেষ করে বস্তাদৌড়ে
আমি তো নড়তেই পারতাম না
মা মাঝেমধ্যে আশপাশের বাসার বাচ্চাদের এনে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন
তখন অবশ্য আমিই প্রথম হতাম
কেননা ওরা সবাই আমার ছোট ছিল
বলেই হেসে ফেলেন নাজমা চৌধুরী
ইস্ট পাকিস্তান হায়ার সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় ফের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন
তিনি এ পরীক্ষায় পুরো বোর্ডের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধা তালিকায় নবম ও মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন
কলেজ-জীবন থেকেই ইচ্ছা ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়ার কিন্তু নাজমা চৌধুরীর মা চেয়েছিলেন মেয়ে সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করবেন
তিনি এ বিষয়ে মেয়ের শিক্ষক শামসুন নাহার মাহমুদের সঙ্গে আলোচনা করলেন
তিনি বলেন তোমার মেয়ে যা পড়তে চায় তা-ই পড়তে দাও
বেশ তা-ই হলো
অনায়াসে ১৯৫৮ সালে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে
তখন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল না
পত্রপত্রিকায় রাজনৈতিক খবরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তেন
তাই তো শেষ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছাতেই এ বিভাগে ভর্তি হওয়া
এখন করতে হবে ভালো ফল
